দেহের বিভিন্ন পয়েন্টে নানান আকৃতির জীবাণুমুক্ত সূচ ঢুকিয়ে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত রেখে চিকিৎসা করাই আকুপাংচার। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ১৯৭৯ সালে আকুপাংচারকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং ২০০৩ সালে একই সংস্থা উল্লেখ করে যে, ১০৩টি শারীরিক সমস্যার সমাধানে আকুপাংচার কার্যকর ভূমিকা রাখে। অন্যান্য চিকিৎসা পদ্ধতি যখন বেশ কিছু রোগের চিকিৎসায় ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে, তখন সে রোগগুলোর ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃত আকুপাংচারচীনে উদ্ভুত প্রায় ৫ হাজার বছরের পুরনো এই চিকিৎসাপদ্ধতি বর্তমানেও ১২০টি দেশে ব্যবহৃত হচ্ছে। 

যেসব রোগে আকুপাংচার কার্যকর:

  • অনিদ্রা (insomnia)
  • অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা (stress)
  • স্বাভাবিক মাথা ব্যাথা
  • মাইগ্রেন এর ব্যথা
  • দীর্ঘমেয়াদী বিষণ্ণতা
  • কোমর ব্যাথা
  • সার্ভাইকাল ও লাম্বার  ডিস্ক  প্রল্যাপস(Cervical and lumber disk prolapse)
  • ফ্রোজেন সোল্ডার
  • সায়াটিকা (sciatica)
  • বাতের ব্যাথা, (Arthritis) 
  • স্পোর্টস ইনজুরি (Argonomy)
  • অটিজম, সেরিব্রাল পলসি, ডাউন সিন্ড্রোম
  • হাঁপানি,  সাইনোসাইটিস 
  • শুষ্ক কাশি
  • হার্টের ব্যাথা (Anginal pain)

 

  • স্ট্রোক থেকে সৃষ্ট প্যারালাইসিস
  • ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়া
  • ডায়বেটিক নিউরোপ্যাথী 
  • পলিনিউরাইটিস, পলিনিউরোপ্যাথী
  • ফ্যাসিয়াল পলসি (গাল বাকা)
  • হাত কাপা (tremor) 
  • খিচুনি (seizure)
  • ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া
  • পুরুষদের যৌন  সমস্যা 
  • স্ত্রীদের বন্ধাত্ব
  • বিভিন্ন স্ত্রীরোগ (মাসিক সংক্রান্ত)
  • দীর্ঘমেয়াদি পেটের সমস্যা 
  • আই বি এস (irritable bowel syndrome)
  • বদহজম
  • দীর্ঘমেয়াদী ঘন ঘন মলত্যাগ 
  • ধূমপান পরিত্যাগ (smoking cessation)

 

আকুপাংচার কিভাবে কাজ করে:

আকুপাংচারবিদ্যা অনুযায়ী, মানুষের শরীরে  অনেকগুলো চ্যানেল বা মেরিডিয়ান রয়েছে যার মধ্যেই আকুপাংচার পয়েন্ট অবস্থিত ।  এই চ্যানেলের মাধ্যমে Biological Energy প্রবাহিত হয়।  চাইনিজ ভাষায় এই Energy কে  (Qi) ‘চি’ বলা হয়। সুস্থ থাকতে হলে এই ”চি” এর ভারসাম্য থাকা অপরিহার্য। কোন কারণে “চি” প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হলে ও ভারষাম্য নষ্ট হলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পায় ফলে, বিভিন্ন রোগের উপসর্গ দেখা দেয় । চিকিৎসার সময় কিছু ‘ডিস্টার্বড পয়েন্ট’,’ডিস্টাল পয়েন্ট’ ও কিছু ‘লোকাল পয়েন্ট’ খুঁজে বের করা হয় এবং তাদের উপর জীবাণুমুক্ত আকুপাংচার নিডেল অনুপ্রবেশ করানো হয়।  সরু নিডেল শরীরের বিভিন্ন পয়েন্টে অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে নার্ভ স্টিমুলেট করে চিকিৎসা করা হয়। এই স্টিমুলেশনের ফলে রক্তসঞ্চালন ও অক্সিজেন সরবরাহ বাড়ে এবং মস্তিষ্ক উদ্দীপিত হয়, যার ফলে ব্যথানাশক রাসায়নিক উপাদান নিঃসরণ করে। 

মেডিক্যা্ল ফিজ়িয়োলজির মতে, মানুষের সমস্ত রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা শরীরের মধ্যেই রয়েছে। সেখানে অসামঞ্জস্য হলেই মানুষ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়।  আরও বিশদভাবে বলতে গেলে, প্রাকৃতিকভাবেই আমাদের শরীরে ব্যথা কমানোর হরমোন  আছে। এই হরমোন মস্তিষ্কের মিডব্রেন ও মেডুলা থেকে বের হয় এবং দেহের বাইরের অঙ্গগুলো থেকে ব্যথার অনুভূতি বয়ে আনা ”নার্ভ ইম্পালসের” সঙ্গে একত্রিত হয়ে স্পাইনাল কর্ডে মিলিত হয়। মস্তিস্ক থেকে আসা, এই ব্যথা কমানোর নার্ভ ইম্পালস, এন্ডোরফিন হরমোন ক্ষরণ করতে সাহায্য করে। 

১৯৭০ এর দিকে বিজ্ঞানীরা এন্ডোরফিন নামক এই রাসায়নিক পদার্থ চিহ্নিত করেছিলেন যা ব্যথা উপশম করতে সাহায্য করে এবং আনন্দ দেয়।

গবেষণায় এটি এখন সুনিশ্চিতভাবে জানা গেছে যে, আকুপাংচার এই এন্ডোরফিনের ক্ষরণ বাড়ায় বা এন্ডোরফিনের প্রবাহ তৈরি করে। ফলে শরীরের এই নিজস্ব ব্যথা কমানোর ”নার্ভ ইম্পালস”,  সক্রিয় হয়ে শরীরের ব্যথা কমিয়ে দেয় ।  এ পদ্ধতিটি প্রায় সম্পূর্ণরূপে যন্ত্রণা বিহীন চিকিৎসা প্রদান করতে সক্ষম যা প্রযোজ্য আকুপাংচারিস্ট ফিজিশিয়ান এর কর্মদক্ষতা এবং অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে। ক্ষেত্রবিশেষে এই চিকিৎসা মাত্র ১০থেকে ৩০ মিনিটকাল স্থায়ী হতে পারে।

আকুপাংচার চিকিৎসার বৈশিষ্ট্যসমূহ: 

১. আকুপাংচারের কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। 

২. ওষুধের প্রয়োজন হয় না, তাই ওষুধজনিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। 

৩. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় সুতরাং পুনরায় রোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা হ্রাস পায়। 

বলা বাহুল্য যে, অন্য কোন চিকিৎসা পদ্ধতিতে সম্ভব হয় না এমন কিছু জটিল রোগের চিকিৎসা করা সম্ভব এই আকুপাংচার এর যথার্থ প্রয়োগ এর মাধ্যমে। তবে রোগীকে যথাযথ চিকিৎসা সেবা প্রদানকারী আকুপাংচারিষ্ট ফিজিসিয়ানকে এই বিজ্ঞান সম্পর্কে যথাযথ শিক্ষা, পর্যাপ্ত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা রাখার কোনো বিকল্প নেই।

সময়ের সাথে এই আকুপাংচার পদ্ধতি এর নতুন সংস্করণ হিসেবে ইলেক্ট্রো আকুপাংচার ও লেজার আকুপাংচার এর ব্যাবহার উন্নত বিশ্বে চোখে পড়ার মতন ও ব্যাপক সমাদৃত।

Recommended Posts

No comment yet, add your voice below!


Add a Comment