হেপাটাইটিস মূলত যকৃতের প্রদাহ কে বুঝায়। এর মূল কারণ – ভাইরাস ঘটিত সংক্রামণ অথবা অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবনের ফলে যকৃতের ক্ষতি। হেপাটাইটিস এ, বি, সি, ডি এবং ই পাঁচটি স্বীকৃত হেপাটাইটিস ভাইরাস। জনাকীর্ণ পরিমণ্ডল এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ হেপাটাইটিস এ এবং ই এর সংক্রামণকে বাড়িয়ে তোলে, যা দূষিত খাদ্য অথবা পানি গ্রহণের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। হেপাটাইটিসবি, সি এবং ডি ভাইরাস সংক্রমণের সাধারণ মাধ্যম হল- দূষিত/কলুষিত রক্তের সাথে যৌনসংযোগ বা এক্সপোজার। 

হেপাটাইটিস সম্পর্কিত অসুস্থতা থেকে প্রতি ৩০ সেকেন্ডে একজন ব্যক্তি মারা যান। তাই, এমনকি বর্তমান কোভিড-১৯ সংকটের মধ্যেও, আমাদের অবশ্যই ভাইরাল হেপাটাইটিসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশ্বব্যাপী ভাইরাল হেপাটাইটিসের অতিরিক্ত চাপ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে এবং বাস্তবিক পরিবর্তনকে প্রভাবিত করার জন্য, বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস-২০২১ এর প্রতিপাদ্য (থিম) হল, “হেপাটাইটিস অপেক্ষা করে না”।

 হেপাটাইটিসের লক্ষণ:

তীব্র বা একুয়েট (স্বল্পমেয়াদী) হেপাটাইটিস এর প্রায়শই কোনো উপসর্গ থাকে না। যদি উপসর্গ দেখা দেয় তাবে সেগুলো হতে পারে:

  • পেশী এবং অস্থিসন্ধিতে ব্যথা
  • উচ্চ তাপমাত্রা
  • অসুস্থ অনুভব করা
  • সব সময় অস্বাভাবিকভাবে ক্লান্তি
  • ক্ষুধামান্দ্য বা অরুচি
  • পেটে ব্যথা
  • গাঢ় প্রস্রাব
  • ফ্যাকাশে, ধূসর রঙের মল
  • ত্বকে চুলকানি
  • জন্ডিস (চোখ এবং ত্বকে হলুদাভাব)

দুরারোগ্য বা ক্রনিক (দীর্ঘমেয়াদী) হেপাটাইটিস কখনো কখনো অলক্ষিত বা অজানা হতে পারে যতক্ষণ না যকৃত সঠিকভাবে কাজ করা বন্ধ করে দেয় এবং কেবল রক্ত টেস্টের মাধ্যমে সনাক্ত করা হয়। এটির কারণে জন্ডিস হতে পারে। পা, গোড়ালি ও পায়ের পাতা ফুলে যেতে পারে। বিভ্রান্তি এবং মলের সাথে রক্ত বের হতে পারে বা পরবর্তী পর্যায়ে বমিও হতে পারে।

বাংলাদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পরিস্থিতি:

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে ২০১৮ সাল থেকে ওয়ার্ল্ড হেপাটাইটিস অ্যালায়েন্সের (ডাব্লুএইচএ) পরিসংখ্যানগত হিসাব অনুযায়ী:

  • ৩৯ মিলিয়ন মানুষ হেপাটাইটিস বি নিয়ে বাস করছেন।
  • হেপাটাইটিস সি ১০ মিলিয়ন মানুষকে আক্রান্ত করেছে।
  • হেপাটাইটিস ই এর ৬.৫ মিলিয়ন সিম্পটোম্যাটিক কেস এবং প্রতি বছর হেপাটাইটিস এ এর ৪০০,০০০ কেস গণনা করা যায়।
  • তিনটি দেশে: ডেমোক্রেটিক পিপলস রিপাবলিক অফ কোরিয়া, মায়ানমার এবং তিমুর-লেস্তে, দুরারোগ্য বা ক্রনিক হেপাটাইটিস বি এর প্রাদুর্ভাব শতকরা ৮ ভাগেরও বেশি।
  • দেশের মোট জনসংখ্যার মধ্যে হেপাটাইটিস সি সংক্রমণের হার থাইল্যান্ডে ২.৭%, মায়ানমারে ১.৭%, বাংলাদেশে ১.৩%, ভারতে ১.৩% এবং ইন্দোনেশিয়ায় ০.৮% বলে অনুমান করা হয়েছিল।
  • যারা ড্রাগ বা মাদক ইনজেকশন নেয় তাদের ৫০% ব্যক্তির মধ্যে হেপাটাইটিস এ উপস্থিত।

রোগনির্ণয়:

হেপাটাইটিস এ, বি, এবং সি রোগ নির্ণয় করতে রোগীর উপসর্গ,শারীরিক টেস্ট এবং রক্ত টেস্ট করা হয়। ইমেজিং পদ্ধতি যেমন সোনোগ্রাম বা সিটি স্ক্যান, সেইসাথে লিভার বায়োপসি কখনো কখনো ব্যবহার করা হয়। একজন ডাক্তার শারীরিক টেস্ট করেন এবং কোনো ব্যক্তি হেপাটাইটিসের সংস্পর্শে এসেছেন কিনা তা নির্ধারণ করতে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেন।

প্রতিরোধ:

হেপাটাইটিসের ধরণের উপর নির্ভর করে, সংক্রামণ প্রতিরোধের বিভিন্ন উপায় রয়েছে।

হেপাটাইটিস এ

হেপাটাইটিস এ প্রাথমিকভাবে দূষিত খাবার এবং পানি দ্বারা সংক্রামিত হয়। সংক্রামণ প্রতিরোধ করতে:

  • টয়লেট ব্যবহার করার পরে এবং খাওয়ার আগে ভালকরে হাত ধুয়ে নিন।
  • নিশ্চিত করুন যে খাবার পুরোপুরি রান্না করা হয়েছে এবং সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে।
  • ভ্রমণের সময়, কেবলমাত্র বোতলজাত পানি পান করুন।
  • দূষিত পানিতে ধোয়া বা উৎপাদিত ফল এবং শাকসবজি এড়িয়ে চলুন।
  • যদি কোনো ব্যক্তি এমন কোনো স্থানে ভ্রমণ করেন যেখানে ভাইরাসটির বিস্তৃতি ব্যাপক, তাহলে তার হেপাটাইটিস এ ভ্যাকসিন সম্পর্কে ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করা উচিৎ।

হেপাটাইটিস বি এবং সি

সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে:

  • কোনো ব্যাক্তির সাথে কোনো ব্যক্তির যৌনসংযোগ থাকলে অবশ্যই তাদের যে কোনো ভাইরাস সম্পর্কে অবহিত করা উচিৎ।
  • সহবাসের সময় কনডম ব্যবহার করুন।
  • শুধুমাত্র পরিষ্কার, অব্যবহৃত ইনজেকশনের সূঁচ ব্যবহার করুন।
  • ব্রাশ, রেজার এবং ম্যানিকিউর সরঞ্জাম কারও সাথে শেয়ার করা উচিৎ নয়।
  • রক্ত এবং অঙ্গ দাতাদের হেপাটাইটিসের জন্য টেস্ট করতে হবে।
  • যারা বেশি ঝুঁকিতে আছেন তাদের জন্য হেপাটাইটিস বি এবং সি স্ক্রিনিং নিয়মিত করা উচিৎ।
  • গর্ভাবস্থায় হেপাটাইটিস বি এবং সি টেস্ট করা। যদি কেউ সন্দেহ করে যে তার হেপাটাইটিস আছে তাহলে তার যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চিকিৎসা সেবা নেওয়া উচিৎ। কারণ একজন ডাক্তার জটিলতার ঝুঁকি সীমিত করার এবং ভাইরাস ছড়িয়ে পড়া এড়ানোর বিষয়ে পরামর্শ দিতে পারেন।

এইচআইভি আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে হেপাটাইটিস বি বা সি সংক্রামিাত হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। যেহেতু শরীর অসুস্থতার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য কম প্রস্তুত থাকেতাই এর পরিণতি আরও গুরুতর হতে পারে।

আমাদের মনে রাখতে হবে যে টিকাদান হেপাটাইটিস এ এবং বি প্রতিরোধ করতে পারে, তবে হেপাটাইসিস সি নয়। হেপাটাইটিস বি এবং সি-এর জন্য চিকিৎসা সহজলভ্য, তবে হেপাটাইসিস এ এর নয়।

আরোগ্য লাভের সম্ভাবনা:

হেপাটাইটিসের ধরণের উপর নির্ভর করে আরোগ্য লাভের সম্ভাবনা বিভিন্ন হয়:

  • হেপাটাইটিস এ: এই বিশেষ স্ট্রেন সাধারণত কোন দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব না ফেলে দুই মাস স্থায়ী হয়। একজন ব্যক্তির প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্ভবত তার বাকি জীবনের জন্য  থাকবে।
  • হেপাটাইটিস বি: বেশিরভাগ ব্যক্তি ৯০ দিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে উঠে এবং সারা জীবন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকে। নবজাতকের ৯০ শতাংশ, বড় শিশুদের ২০ শতাংশ এবং প্রাপ্তবয়স্কদের ৫ শতাংশ ক্রমাগত সংক্রামিত হচ্ছে। এর ফলে লিভার ক্যান্সার বা সিরোসিসের মতো গুরুতর পরিণতি হতে পারে।
  • হেপাটাইটিস সি: এটি একটি দুরারোগ্য সংক্রামকরোগ। এটি সংক্রামিতদের ৭৫ থেকে ৮৫ শতাংশ আক্রান্ত করে, যার ১ থেকে ৫ শতাংশ প্রাণঘাতী পরিণতি আনতে পারে। এ রোগের চিকিৎসা আছে, তবে যাদের চিকিৎসা করা হয় তাদের মধ্যে প্রায় ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ সুস্থ হয়ে উঠে।

চিকিৎসা

হেপাটাইটিস এএর কোনও নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। হেপাটাইটিস এ এর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, যকৃত ছয় মাসের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ না হয়ে পুনরুদ্ধার করে। তবে আপনার সংক্রামণের পুরো সময়কাল জুড়ে প্রতিটি পদক্ষেপে ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করা গুরুত্বপূর্ণ। আপনার সুস্বাস্থ্যের জন্য নিচের বিষয় গুলো লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন হতে পারে:

  • যতটা সম্ভব বিশ্রাম নিন  – হেপাটাইটিস এ আছে এমন অনেক লোক ক্লান্ত, অসুস্থ এবং খুব দূর্বল থাকেন।
  • বমি বমি ভাব কমাতে সারা দিন ধরে নাস্তা– বমি বমি ভাব খাওয়া কঠিন করে তুলতে পারে, তাই পুরো খাবার একসময়ে খাওয়ার পরিবর্তে দিনের বিভিন্ন সময়ে স্ন্যাকিং বা অল্প অল্প করে নাস্তা করার চেষ্টা করুন।
  • অ্যালকোহল পান করা এড়িয়ে চলুন – আপনার যকৃত অ্যালকোহল সঠিকভাবে প্রক্রিয়া করতে পারে না এবং সম্ভাব্যভাবে যকৃতের আরও ক্ষতি করতে পারে।
  • ওষুধ সেবন করুন – ওভার-দ্য-কাউন্টার ওষুধসহ আপনার সমস্ত প্রেসক্রিপশন সম্পর্কে আপনার ডাক্তারকে অবহিত করুন।

 একইভাবে, হেপাটাইটিস বি এবং সি সংক্রামণ রোধের জন্য,স্বাস্থ্য কীভাবে পরিচালনা করতে হয় সে সম্পর্কে গাইড করার জন্য ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করুন। ডাক্তাররা বিশ্রাম, প্রচুর তরল এবং সঠিক পুষ্টির পরামর্শ দিয়ে থাকেন। উপরন্তু, যদি রোগটি দুরারোগ্য সংক্রামণের দিকে মোড় নেয় তবে চিকিৎসার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে:

  • অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ – কোন ওষুধটি আপনার জন্য সর্বোত্তম তা নির্ধারণ করতে ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করুন। এগুলি আপনাকে ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে এবং আপনার যকৃতের ক্ষতি করার সংক্রামণের ক্ষমতা হ্রাস করতে সহায়তা করতে পারে। এই ওষুধ গুলো মুখে খাওয়ার। হেপাটাইটিস সিএর ক্ষেত্রে,লক্ষন হলো চিকিৎসা শেষ করার পরে কমপক্ষে ১২ সপ্তাহ আপনার শরীরে ভাইরাসের কোনো চিহ্ন না থাকা। 

লিভার প্রতিস্থাপন – গুরুতর জটিলতার জন্য, যকৃত প্রতিস্থাপন একটি বিকল্প হতে পারে। শুধুমাত্র যকৃত প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে হেপাটাইটিস সি খুব কমই নিরাময় হয়। সংক্রামণটি পুনরুজ্জীবিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং প্রতিস্থাপিত যকৃতকে আরও ক্ষতি হাত থেকে রক্ষা করার জন্য আপনার ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসার প্রয়োজন হবে।

হেপাটাইটিসকে পরাস্ত করতে, আমাদের সঠিক জ্ঞান এবং শিক্ষা, সতর্কতা, ভ্যাকসিন এবং স্বাস্থ্যকর জীবন বিধি অনুশীলন করতে হবে।

Recommended Posts

No comment yet, add your voice below!


Add a Comment